জ্ঞানের রাজ্য!

সেটা ছিল ৮৮ সাল।
৮৮’র ভয়াবহ বন্যার কথা সকলেরই মনে থাকার কথা।
 
গ্রামের বাড়ী। ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে গেল প্রায় হাত দেড়েক। অদ্ভুৎ কষ্টকর কিন্তু ছোট বয়সের ভাললাগার অনুভুতি।
সারাদিন ছোট নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। ভালই নৌকা চালাতে পারি আমি।
 
একটানা প্রায় মাস তিনেকের বন্যা। বন্যার শুরুটা ছিল প্রতিদিনই কয়েক ইঞ্চ করে নদীতে পানি বাড়তে থাকলো আশঙ্কাজনক ভাবেই।
 
প্রতিদিন গড়ে ৫/৬ ইঞ্চ করে পানি বাড়তে বাড়তে নদীর দু’কুল ভাসিয়ে দিয়ে আমাদের বাড়ীর সামনের খেলার মাঠও ডুবে গেল।
 
এরপর রাস্তা ডুবলো।
এরপর বাড়ীর উঠোন ডুবলো।
এরপর ঘরের ভেতেরর মেঝোও ডুবলো।
আমাদের ঘরের ভেতরটাতেই পানি ছিল একটানা প্রায় দু’সপ্তাহ।
 
অতপর একদিন পানি কমতে লাগলো।
কয়েকদিন কমে ঘরের মেঝো থেকে পানি নেমে গেল, উঠনও শুকালো।
 
কিন্তু হতবাক করে দিয়ে আবারও বৃদ্ধি পেল সেই পানি। আবারও সপ্তাহ খানেক।
 
তারপর আবার ঠিক একই সূত্রে আস্তে আস্তে পানি কমতে বা নামতে শুরু করলো।
 
ঘরের মেঝো থেকে পানি নামলো। উঠোন শুকালো। রাস্তার পানিও নেমে গেল গ্রামের সমস্ত রাস্তাঘাটকে ভেংগে দিয়ে।
 
অতপর মাঠের পানিও নামলো।
এবং শেষ টায় নদীর পানি সেই নদীতেই।
 
আসলে এটাই বন্যার খেলা।
খেলাটা এখানেই শেষ হতো পারতো। কিন্তু হলো না।
 
বন্যার চরিত্রগুলি ঠিক এমনই।
বন্যা বলতে আমি এটাই জানতাম যে নদীর পানি বাড়তে থাকবে। বাড়তে বাড়তে মাঠ ডুবে যাবে। রাস্তা ডুবে যাবে। এভাবে দেড় দুই মাস সবকিছুই ডুবে থাকবে।
 
এভাবে নদীর যখন ভরা যৌবন- তখন আমরা একটা ছোট নৌকা কিনবো।
সারাদিন নৌকা চালাবো।
সে এক অদ্ভুৎ আনন্দ।
 
তারপর সেই ভরা যৌবনের নদীতে শুরু হবে নৌকা বাইছের উৎসব।
সে আরেক উত্তেজনাময় উৎসব।
 
এটাই গ্রাম বাংলার চিত্র।
 
এখন যদি আমি ‘বন্যা’ নিয়ে অাপনাকে একটা রচনা লিখতে বলি- আপনি কিন্তু আমারচে আরও সুন্দর করে- আপনার অভিজ্ঞতা লিখে দিতে পারবেন। যদি আপনি বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ হন।
 
কিন্তু।
কিন্তু, আমার সেই চির-চেনা ও নিজ চোখে দেখা বন্যার চিত্রটিও যে ভুল হতে পারে- সেটা কি আমি কোনদিনও ভেবেছিলাম?
 
২০০৩ কিংম্বা ২০০৪ সালে গেলাম ভোলা।
বন্যার মৌশুম।
 
ভোলা বাংলাদেশের একটি উপকুলীয় জেলা এবং একমাত্র জেলা যেটা সম্পূর্ণ একটা দ্বীপ নিয়ে-ই গঠিত।
 
শুনলাম বন্যা হয়েছে।
আমার শ্বশুর বাড়ী ছিল ভোলা সদরের ইলিশা’র একটা গ্রামে। গ্রামের নামটা মনে করতে পারছি না। সেটা এখন আর নেই- মেঘনা নদী গর্ভে বিলীন।
 
শ্বশুর বাড়ীর সকলে ভোলা সদরে আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা থেকে রক্ষা পেতে।
আমি বন্যা দেখতে যাবো।
 
কোন এক দুপুরে রওয়ানা দিলাম।
সেই গ্রামের ঐ বাড়ীতে গেলাম।
 
আশ্চর্য্য। কোথায় বন্যা?
এখানে তো বন্যার কোন অস্তিত্বই নেই।
কিছুটা ‘বোকা’ হয়ে জানতে চাইলাম ‘কোথায় বন্যা?’
 
তারা কেউ মনে হলো না যে আমার এই ‘অদ্ভৎ প্রশ্ন’র মানেটা বুঝতে পারলো?
উত্তর এলো, ‘বন্যা তো এখন না’।
আমি আরও হতবাক! বন্যার জন্য এরা গ্রাম ছেড়ে শহড়ে আশ্রয় নিয়েছে, আর বলছে বন্যা নাকি এখন না!
 
এটা কোন কথা হলো?
ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না যে ‘বোকা’ আমি না কি এরা সকলে?
 
কেউ একজন বলল একটার পর বন্যা আসবে?
 
আমি খুব ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলাম। কথাটা কি তাহলে একটার পর ‘জোয়ার’ আসবে?
তাহলে এই দেশে কি জোয়ার’টাই ‘বন্যা’!
 
কক্সেস বাজারের কথা মনে হলো।
সেখানে দিনে দু’বার জোয়ার আসে। একবার দুপুরের পর আরেক বার মধ্য রাতের পর।
 
আমি মনে মনে হিসাবটা মেলালাম। ভোলাও তো উপকুলীয় অঞ্চল। বঙ্গপোসাগরের লাগোয়া।
 
যা বুঝার আমি বুঝলাম।
এবং একটু পরই দেখলাম, জোয়ার আসছে।
 
হ্যা, জোয়ার আসছে। খুব আস্তে নয় অস্বাভাবিক দ্রুততায় খালটা ভরে গেল আমার চোখের সামনে। পানি বাড়ছে, আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছি।
 
পানি বাড়ছে।
খাল ভরে গেল।
উঠোন ডুবে গেল।
আমরা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিলাম, খাটের উপর গিয়ে বসলাম।
 
ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকলো।
 
তারপর ঘন্টা খানেক।
আবার পানি নামতে শুরু করলো।
এবং সন্ধ্যার আগেই সব পানি হাওয়া।
 
আবার নাকি মধ্য রাতে ‘বন্যা’ হবে।
 
একটাই বাংলাদেশ আমাদের। খুবই ছোট একটা দেশ। গাদাগাদি করে আমরা ১৭ কোটি মানুষ।
 
এখন আপনি উপকুলীয় অঞ্চলের মানুষকে ‘বন্যা’ নিয়ে একটা রচনা লিখতে দিন।
অপরদিকে যে জীবনে কোনদিনও উপকুলীয় অঞ্চলে বন্যার সময় ভ্রমণ করেনি- তাকে একটা রচনা লিখতে দিন এই একই ‘বন্যা’ নিয়ে।
 
একই ‘বন্যা’ কিন্তু তৈরী হবে দুই রকমের রচনা।
 
বলুন তো আপনি কোনটা লিখবেন?
একটু না হয় চিন্তা করেই বলুন।
 
জোয়ারে কথা যখন বললামই, এবার ভাটার কথাও বলি।
 
সেটা সম্ভবত ১৯৯৬ সাল।
আমার এক কাকা প্রচন্ড অসুস্থ্য। বার্ধক্যজনিত কিছু জটিলতায় ভুগছেন।
 
প্রকৃতির কিছু খেলা আছে, যা মাঝে মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এই তো সেদিন দেখলাম স্বাভাবিকের’চে ১৩ শতাংশ বড় ‘মুন’ দেখলাম আমরা। অনেকেই দেখলাম ছবি তুলে অাপলোড করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
 
তো, সেই বছর কোন একদিন হঠাৎ পেপারে পড়লাম ‘সূর্য্য গ্রহণ’ হবে। দিন তারিখ জানলাম। আমাদের গ্রামের বাড়ীতেও নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাটা আমি পড়তাম। গ্রামের সকলে তো আর অত খবরাখবর রাখতেন না।
 
সেই সূর্য্য গ্রহনটা নিয়ে লেখা একটা রিপোর্ট দেখলাম, ‘গুরত্বর অসুস্থ্য’ লোকজন এই সূর্য্য গ্রহণের সময় মারা যেতে পারেন। বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবালো।
 
আমি একটু পান্ডিত্ব্য নিয়ে গ্রামের ভেতরে মোটামুটি খুব কাছের আত্মিয়-বন্ধুদের বলে দিলাম, ‘অমুক কাকা সম্ভবত ওদিন ভোরে মারা যাবে’।
 
আমার কথা অনেকেই গুরুত্ব সহকারে নিলো, আবার কেউ কেউ দেখলাম পাত্তা দিল না।
 
যাই হোক, সেই সুর্য্যগ্রহনের দিন ভোড়েই আমার সেই কাকা মারা যান।
আসলেই গ্রহ-নক্ষত্র, জোয়ার-ভাটা, বা সূর্য্য গ্রহণের সংগে পৃথিবীর একটা শক্তিশালী বন্ধন রয়েছে যা পরীক্ষিত সত্য।
 
আপনি বিশ্বাস না করলে নেই।
আমার কথা আমি বলে যাই।
 
এই পৃথিবীটা অনেক বড়। অনেক।
বাংলাদেশ ৬টা ঋতু চক্র। ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে বেশ শীত থাকে। খুব শীত, তাই না?
চাদর-মুরি বসে সকালের মিষ্টি রোগে তাজা খেজুরের রস! ওহ কি শীত!
বিকেলে আমি চলে যেতাম অনেক দূরের কোন বাজার বা হাটে ‘এক কাপ তাজা রসের চা’ খাওয়ার লোভে।
 
বাংলাদেশের শীতকালটা সত্যিই খুব উপভোগ্য। দলবেধেঁ পিকনিক, আরও কত কি!
 
আসলে, সত্যি করে যদি বলি- ‘ওটা কোন শীত’ই নয়। শীতের মধ্যেই ওটা পরে না। তবে অসাধারণ আনন্দময় আবহাওয়া। প্রাণবন্ত বাংলাদেশ দেখা যায় শীতের সময়টাতেই।
 
বাংলাদেশ থেকে একটু দক্ষিনে যদি যাই- শুরু হয়ে যাবে বিষুব রেখা।
 
একটু যান না- ঘুরে আসুন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, হংকং, ইন্দোনেশিয়া দেশগুলি। সেখানে শীত পাবেন না। সারা বছরই একই ওয়েদার। কুনমিং চলে যান চির বসন্ত।
 
বিশাল ভারত-বর্ষ ঘুড়ে আসুন।
একটা প্রবাদ আছে ‘যে সম্পূর্ণ ভারত-বর্ষ ভ্রমণ করেছে তার বাদবাকী পৃথিবী ভ্রমণের কোনই প্রয়োজন নেই’। ভারতবর্ষটা এতটাই বড় এবং বৈচিত্রময় একটা দেশ। আপনি মুগ্ধ হবেনই। মুগ্ধ হবার মতো অনেক কিছুই রয়েছে ভারতবর্ষে।
 
বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় এর যাষ্ট উপরে হয়ে শিলীগুড়ি দিয়ে চলে যান দার্জিলিং। মে-জুন এর প্রচন্ড গরমেই যান। ওহ, সংগে কিন্তু যথেষ্ঠ পরিমাণ শীতের অতি গরম জামা নিতে ভুলবেন না। আর, পকেটে ‘লিপজেল’ না থাকলে আপনার ঠোঁটেরও খবর আছে!
 
ডিসেম্বর মাসে চলে যান সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। ছংগু লেকে দেখবেন স্বচ্ছ পানি বরফ হয়ে জমে রয়েছে। তার উপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটেও আসতে পারবেন। আরেকটু উপরে যান, কিভাবে স্নো পড়ে সবকিছু সাদা হয়ে থাকে স্বচোক্ষে দেখে আসুন। ক্যামেরটাও নিয়ে যাবেন কিন্তু!
(কিন্তু বাংলাদেশের ‘অতি বন্ধু’ রাষ্ট্র ভারতে যে আপনাকে সিকিম প্রবেশের অনুমতি দিবে না- সেটা কিন্তু আপনি জানেনও না। সুতরাং ওটা স্বপ্নই থাক আপাতত।)
 
আমি এখন অাছি উত্তর গোলার্ধের একটি শহর নিউ ইয়র্কে।
আজ প্রচন্ড শীত ছিল। অবশ্য স্নো এখনও শুরুই হয়নি। এবছর নিউ ইয়র্কাদের খবর আছে- ভয়াবহ শীত আসছে সামনে। আমার বন্ধু সাইদুর ভাই থাকেন আমেরিকার পশ্চিম দিকের ওয়াশিংটন ষ্টেটের রাজধানী সিয়াটলে- সকালে দেখলাম তার ওখানে স্নো পরা শুরু হয়ে গেছে, ভদ্রলোক বেশকিছু স্নো নিয়ে খেলা করার ছবি আপলোড করেছেন।
 
আরও একটু উপরে কানাডায় যারা থাকেন- তারাও অলরেডী স্নোতে সাদা হয়ে আছে। শীতের বর্ণনা আর না দিলাম, ও বর্ণনা শুনলেও শীত লাগে শরীরে।
 
এই কঠিন শীতেই একটু ঘুরে আসুন অষ্ট্রেলিয়ার সিডনী অথবা দক্ষিন আফ্রিকার কেপটাউন কিংম্বা আর্জেনটিনার বুয়েন্সআয়ার্স থেকে। শীতের কাপড় নেবার কোন দরকারই নেই- গরম চলছে সেখানে।
 
আসলে এই পৃথিবীটা অনেক বড়। আপনার আমার চিন্তার চেয়েও বড়।
সেদিন আমি নিউ জার্সী শহরের একটা ‘ইউনিভার্সিটি’ ভিজিট করে আসলাম। প্রিন্সটন উইনিভার্সিটি। সকলেরই এই বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম শোনার কথা। ছাত্রাবস্থায় অনেক নাম শুনেছি।
 
আমাদের গাইড যখন আমেরিকার চতুর্থতম পুরাতম ও বড় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পর্কে বলছিল, শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসছিল বার বার।
 
এই বিশ্ববিদ্যালয় টির ৪১ জন ছাত্র বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরুষ্কার পেয়েছেন।
একটাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪১ জন নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। আমেরিকার মতো দেশের দুই দুইজন প্রেসিডেন্ট এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই উপহার।
বিদায়ী ফাষ্ট লেডী মিশেল ওবামাও প্রিন্সটন গ্রাজুয়েট। প্রিন্সটন সম্পর্কে লিখতে গেলে আমাকে আরও একমাস সময় নিতে হবে; তারপরও অনেক কিছুই বাদ পরে যাবে অথবা আমার জানারও বাইরে রয়ে আছে।
 
কতটুকুই বা আমি জানি বলুন?
নিজের জ্ঞানের পরিধি নিয়ে যতবারই আমি ভাবি- নিজেকে সত্যিই আমার খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়। এতো সামান্য অর্জিত জ্ঞান নিয়ে কত বাহাদুরী করি আমি! মাঝে মাঝে  নিজেকেই ধিক্কার দিই। প্রচন্ড হীনমন্যতায় ভুগি নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দেখে। আমি আমার অনেক লেখায় আমি উল্লেখ করে থাকি, প্রতিটি মুহুর্তে, প্রতিটি মানুষ থেকে- সে শিশু বাচ্চা হোক বা বৃদ্ধ, ঘটে যাওয়া প্রতিটি বিষয় থেকেই রয়েছে অনেক অনেক কিছু শিখার।
 
আমেরিকায় আসার পূর্বে আমি আমিরেকা নিয়ে অনেক স্ট্যাডি করার চেষ্টা করতাম। প্রচুর মুভি দেখতাম। ইন্টারনেট ঘেটে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতাম। এওএল ম্যাসেঞ্জার এ ঢুকে প্রচুর আমেরিকান ছেলে-মেয়েদের সংগে ফ্রেন্ডশীপ করতাম, চ্যাটিং করতাম। কত কিছু যে শিখার রয়েছে, কত কিছু যে রয়েছে জানার বাইরে- চিন্তাও করতে পারি না।
 
আমেরিকা এমন একটা দেশ- যে দেশটার সৃষ্টি না হলে আমরা হয়তো বিজ্ঞানের এতটা অগ্রগতি দেখতেই পেতাম না। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেলফোন, ইন্টারনেট, সোসাল নেটওয়ার্কিং সবই তো এদের অবদান।
 
শুধু কি তাই। আমি এই দেশটার কাছে প্রতিদিন নিজের ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা বাড়িয়েই চলছি। আমার অনেক লেখাতেই আমি উল্লেখ করি অনেক সময়ই।
 
যাই হোক। আসলে যে কথাটা বলার জন্য এতো লম্বা ভূমিকা নিচ্ছি, সেটাই বলি এবার।
আচ্ছা, বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন ছাত্র নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন যেন? এটাকে না কি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো? কে বলতো?
 
শিক্ষকদের নীল দল, সাদা দলের দলবাজী আর গর্বিত মহান ছাত্রদের গাড়ী ভাংগা ছাড়া আর কি উল্লেখ করার মতো পাওয়া যাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে?
 
হ্যা, একজন পাওয়া গেছে। ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন- যদিও তার কোন মেরুদন্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি কোন দিনও। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ই তো উপহার দিয়েছে পুলিশ লীগের ডিআইজি মনিরুল ইসলামের মতো ‘রাষ্ট্রিয় খুনী’ এবং ‘ড. আতিয়ার রহমানের’ মতো রিজার্ভ চোরদের!
 
যাক, সেদিকেও যাচ্ছি না। ওদের বাইরেও হাজারো সত্যিকারের গর্বিত ছাত্রদের অপমান হোক আমার লেখায় সেটা আমি চাবো না। অবশ্যই অনেক সুর্য সন্তানও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে এসেছে; তাদের শ্রদ্ধা জানাই।
 
আচ্ছা, ভালো কথা! 
সাপ চিনেন তো। বিষধর সাপ।
আপনি যদি একটা বিষধর সাপের গলাটা কেটে ফেলে দেন- তাহলে কিন্তু সাপটা মারা যাবে। এটা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই হয়। স্বাভাবিক একটা বিষয়।
 
কিন্তু অস্বাভাবিক বিষয়টা কি জানেন?
ঐ মারা যাওয়ার সাপটার মাথাটা; বেশ কয়েক দিন পরও যদি ঐ মারা যাওয়া সাপটার মাথাটার মুখের কাছে আপনার হাত বা পা নেন- তখনও কিন্তু ঐ মারা যাওয়া সাপটা আপনাকে কামড়ে দেবে।
 
এবং আপনি মারা যাবেন।
একটা মারা যাওয়া সাপের মাথা অনেক সময় ৩দিন পরও একজন মানুষকে কামড়ে মেরে ফেলতে পারে।
 
কারণটা খুবই সাধারণ।
সাপের শরীরটা অটোমেটিক কাজ করে- শরীরটা তৈরীই করা হয়েছে ওভাবেই। শরীরের কাছে কিছু থাকলে সে পেচিয়ে ফেলবে লতার মতো। মুখের কাছে কিছু গেলে কামড়ে দেবে। এমন কি মারা যাবার পরও কয়েকদিন পর্যন্ত।
 
কাজটা সাপ-কে নিজ থেকে না করলেও চলে; অটোমেকিটলি-ই তা হয়ে যায়। সাপ এই বৈশিষ্ট্যটা প্রকৃতি থেকেই পেয়েছে।
 
বিষয়টা বেশ মজার না!
আমি কিন্তু এরচেও একটা মজার বিষয় বলতে পারি।
 
মানুষের ভেতরেও কিন্তু এই ‘অটোমেটিক; কাজ করার বিষয়টা রয়েছে।
বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই তো?
 
সহজ করে দিই।
সবাই বলে না ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’। মানুষ যা কিছু অনুশীল করবে- তাই-ই এক সময় তার বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়ে যাবে। অনেকটা ঐ সাপের প্রকৃতি থেকে পাওয়া বৈশিষ্ট্যের মতোই। আর মানুষের উচিৎ সর্বাবস্থায় ভাল বিষয়গুলি অভ্যাসে পরিণত করা।
 
আমি যা বলতে চাচ্চি তাহলে, আসলে এই পৃথিবীতে ৭৫০ কোটি মানুষ বসবাস করছি আমরা। আমরা কিন্তু ৭৫০ কোটি ইন্ডুভিজুয়াল ক্যারেক্টর। একজন থেকে অন্যজন আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের সকলের কাজ, চিন্তা, কৌশল এবং চারিত্রিক ভিন্নতা রয়েছে। আপনি যেভাবে চিন্তা করছেন- আমি কিন্তু সেভাবে চিন্তা করছি না। আমি কিন্তু গান করতে পারি না- আমার গানের গলা নেই। আমি হাজার বছর ট্রেণিং দিয়েও ‘হাবিব ওয়াহিদ’ হতে পারবো না। অপরদিকে আপনি ‘হাবিব ওয়াহিদ’ কে হাজার বছর ট্রেনিং দিন- সে ‘তৌফিকুল ইসলাম পিয়াস’ হতে পারবে না। হওয়া সম্ভব না।
 
আমরা আসলে অনেক কিছুই জানি না। আমরা ভুল করি অন্যকে নিজের সংগে তুলনা করে। আমরা জানিইও না যে- আমার ‘সত্যিকারার্থে কত কম জ্ঞান’ নিয়ে এই পৃথিবীতে বসবাস করি।
 
মুল কথায় ফিরি।
আমি বিগত বেশ কিছুদিন যাবৎ বাংলাদেশের বেশ কিছু ‘চেতনাবাজ ও নাস্তিক’ ব্লগারদের পেইজে ঢুঁ মেরেছি- তারা কি লেখে, কতটুকু যুক্তি দাড় করাতে পারে, কতটুকু তাদের জ্ঞানে পরিধি তা একটু অনুসন্ধানের জন্য। যদিই সেখান থেকে কিছু জ্ঞান অর্জন করতে পারি।
 
না। আমি সত্যিই হতাশ।
ছোট নদীর মাছ মহাসাগরে পরলে যেমন কুল হারিয়ে ফেলে- এদের অবস্থা ঠিক তেমনই।
ওদের লেখায় আমি ‘জ্ঞান’ অর্জনের কিছুই পাইনি। ওদের জ্ঞানের পরিধি সত্যিই খুবই ছোট। নিতান্তই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা ডিগ্রি-ই এদের একমাত্র পুঁজি। বাস্তব জীবনের কোন অভিজ্ঞতাও এদের নেই।
 
আমার মনে হয়নি এরা কেউ উপকুলীয় ‘বন্যা’ও দেখেছে কোনদিন।
এরা গদ্য লিখে রংপুরের বন্যা’র জ্ঞান নিয়ে।
এরা কবিতা লেখে নারীর শরীর আর রসালো কামনার উপর ভর করে।
আর এরা নিজেদের এতটাই জ্ঞানী ভাবে যে, সরাসরি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই চ্যালেঞ্জ করে বসে।
 
আমি আজ বাংলাদেশের সবগুলি নাস্তিককে চ্যালেঞ্জ ছুড়লাম, ‘আসুন আমার সংগে বসুন, আমি একা শুধু একটা ইন্টারনেট সংযুক্ত ল্যাপটপ নিয়ে বসবো। আপনারা ১০০ জন আমার সংগে বসুন। আপনাদের সংগে আমি তর্কে জড়াবো- আপনাদের জ্ঞানের যে-কোন বিষয় নিয়ে কথা বলবো, যুক্তি দিয়ে আপনাদের পরাজিত করবো। চ্যালেঞ্জ! আপনারা আমার সংগেই তো পারবেন না।
 
আপনারা ‘ঈশ্বর’কে কি চ্যালেঞ্জ দেন?’
 
ঈশ্বর শব্দটাতো আপনারা ঠিক-ঠাক বানানও করতে পারেন না।
ইমরাম এইচ সরকার অনেক বছর আগে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিষ্টে ছিল। তখনও শাহবাগী হয়ে উঠেনি। শাহবাগ যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো- তখনই আমি ওকে আলাদা ভাবে দেখলাম আমার লিষ্টে।
 
একদিন ওর প্রফাইলটা ভিজিট করলাম।
সে ডাক্তার। তার প্রফাইলে দেখলাম সে বাংলাদেশের সবগুলি প্রেষ্টিজিয়াস ক্লাব বা অর্গানাইজেশনের সদস্য হয়ে বসে রয়েছে। এমনকি সে সেখানে নিজেকে ‘এফবিসিসিআই এর জেনারেল বডি মেম্বার’ও বানিয়ে রেখেছে।
 
আমি খুব সুন্দর করে তার ওয়ালে লিখলাম, ‘আপনি ঠিক কোন এসোশিয়েশন এর সদস্য? না কি চেম্বারের? আমাকে কি একটু জানাবেন?’
 
ওমা! সে কি? পরের দিন দেখে আমি ব্লক!
অবশ্য অন্য আইডি দিয়ে দেখতে পেলাম- এফবিসিসিআইও উধাও!
 
আমি সত্যি অবাক হই ওদের লেখায় কি আছে যা পড়তে মানুষ ওদের লাইক দেয়, ফলোয়ার হয়? একটা বিষয় আশ্চর্যজনক ভাবে লক্ষ্য করেছি ওদের ফলোয়ারদের মধ্যে ৭৫% বাংলাদেশের একটা বিশেষ গোত্রভুক্ত। এবং আরও মজা পেয়েছি- ওদের লেখার কমেন্টের শতকরা ষাটভাগই ওদের বিরুদ্ধমত এবং তারা নিয়মিত ওদের গালা-গালিতে ব্যস্ত; যারা কিনা বাকী ২৫% ফলোয়ার।
 
হাউ ফানি?
সময় নস্ট করে গালাগালি করার জন্য ওদের পেছনে লেগে থাকারই বা দরকারটা কি?
 
কেন বুঝেন না যে, জ্ঞানী হলে তো আর ওরা ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তো না।

আসলে আমরা যে কতটা সীমিত জ্ঞান নিয়ে এই পৃথিবীতে বসবাস করছি- সেটা বোঝার মতো জ্ঞানও আমরা অর্জন করতে করতেই পরপারে চলে যাই।

বুঝিও না।

এই পৃথিবীটা সত্যিই অনেক বিশাল। অনেক।

অথচ, আপনি যদি একবার চোখ বন্ধ করে সৌরজগতের দিকে তাকান- তখন পৃথিবীটাকে কি মনে হবে আপনার? আপনাকেই বা কি মনে হচ্ছে? কতটুকু আমরা?

এবার একটু না হয় মিল্কিওয়ের দিকে তাকাই চলুন। খুঁজে দেখেন তো আপনি কোথায়? কোন অস্তিত্ব খুঁজে পান আপনার?

কত হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের তারারা রয়েছে এই বিশাল মহাশূণ্যে!
আমি চমকে উঠি ভাবলে! ভীত হয়ে যাই! কোথায় আমার অস্তিত্ব?

নিজেকে তখন আর খুঁজে পাই না।

থাকনা আলোকবর্ষ দূরের ওসব কথা।
এই পৃথিবীরই মহাসাগরের নীচের অতল গহ্বরে কি রয়েছে- এখন কি পরিপূর্ণ আমরা জানি?

না, জানি না। জানা হয়ে উঠেনি এখনও।
সাউথ পোল বা দক্ষিন মেরুতে শুধুমাত্র কয়েকটা দেশ তাদের পতাকাই উড়িয়েছে- উপনৈবেশিক মানসিকতার স্বার্থে; কিন্তু জয় এখনও করা হয়ে উঠেনি।

তাহলে আর কিসের গর্ব আমাদের? কিসের এতো অহংকার?
আমি সত্যিই ভাবতে পারি না- অতটা ভাবার মতো মেধা আমাদের নেই।

সামান্য পৃথিবীর খবরই আমরা রাখতে পারি না- আবার সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে গবেষনা করবো?

থাক সেসব জ্ঞানের কথা।

এবার একটা ব্যক্তিগত কথা।

‘এই লেখাটা শুরু করার অাগে ভাবিনি কি লিখবো; বসলাম কমপিউটারে এবং টোটাল সময় লাগলো ১ ঘন্টা। লেখাটা অনেক বড়। আমি এই ষাট মিনিটই ভেবেছি এবং ষাট মিনিট সময় নিয়েই এটা লিখলাম। আলাদা করে ভাবিনি আগে- ঠিক কি লিখতে হবে।

এটাই আমার নিজস্বতা।

আপনারও কিছু নিজস্বতা রয়েছে- সেটাকে কাজে খুঁজে বের করুন এবং কাজে লাগান; নিশ্চিত সফল হবেন।

এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কিছু ‘অকৃত্রিম’ নিজস্বতা নিয়ে জন্মেছে- বিশ্বকে কিছু দেবার জন্য।

আপনারও রয়েছে কিছু- নিজের ভেতর থেকে খুঁজে নিন। পেয়ে যাবেন- সেটাকে উম্মুক্ত করে দিন।

আমাদের যার যতটুকু রয়েছে- সেটুকুই আমরা ব্যবহার করি।

সমৃদ্ধ হোক আমাদের পৃথিবী। আরও একটু।

en.pdf24.org    Send article as PDF