বাংলাদেশ সরকার ও ব্যবসা!

আমার বন্ধু শিপন, ও আর আমি একই কলেজে একই সংগে পড়াশোনা করেছি। ও পড়াশোনা শেষ করে নুর আলী’র ইউনিক গ্রুপে ‘একাউটেন্ট’ হিসাবে জয়েন করেছে আর আমি আমার ব্যবসায়িক লাইনে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছি। শিপন আমার সম্পর্কে মামাতো ভাইও হয়; যদিও বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্কটাই তখন বেশী প্রতিষ্ঠিত ছিল।
 
আমার সেই যুদ্ধের প্রথম পরিকল্পনা মাফিক ‘প্রথম ধাপ’ সফলভাবে শেষ করে নবাবগঞ্জের ব্যবসা ক্লোজড করে ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করি। শুরুর পরপরই হঠাৎ সেই শিপন একদিন আমাকে ফোন করে। সে ঠিক-ঠাক গুছিয়ে কিছু বলতে পারছিল না; আইটি বা টেলিকম প্রযুক্তি বিষয়ক কিছু একটা বিষয়; সে আমাকে সময় দিতে বলল একদিন। আমিও তখন ততটা বিজি না বিধায় পরদিনই সময় করলাম।
 
আমি যে সময়টার কথা বলছি সেটা ২০০০ সালের কথা। তখন এক মিনিট মোবাইল কল রেট ছিল ৭ টাকা, ঢাকা থেকে সিটাগং এর এনডব্লিওডি ল্যান্ড বা টিএন্ডটি কলের রেট ছিল মিনিট প্রতি ৩৬ টাকা এবং মিডিলইষ্ট, ইওরোপ, অষ্ট্রেলিয়া আর আমেরিকার মিনিট প্রতি কল রেট ছিল ৮৬ টাকা।
আমি তখন ঢাকার ‘গণফোন’ এর আনলিমিটেড ইন্টারনেট টিএন্ডটি লাইন দিয়ে ইউজ করা শুরু করেছি- গণফোনকে মাসে প্রেমেন্ট করতে হতো ৫৬০০ টাকা। আর আমার মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার সেই ছোট বাসা-টার ভাড়া ছিল ৩৫০০ টাকা- যেটাকে অামি তখন অফিস হিসাবেই ইউজ করতাম।
 
শিপন আমাকে শ্যামলীতে একটা বাড়ীতে নিয়ে গেল। তিন তলায় ড্রয়িং রুম টাইপ অফিস। সেখানে দশ-বারো জন বিভিন্ন বয়সী লোকজন বসা। সামনে একজন লেকচার দিচ্ছেন। আর একজন কমপিউটার নিয়ে তাকে সহযোগীতা করে যাচ্ছে।
 
শিপন আমাকে বলল, ওই লেকচারার ভদ্রলোক ওর মামা ড. শামস্। আর কমপিউটার নিয়ে যে বসে সহযোগীতা করে যাচ্ছে সেও মামা, ওনার ছোট ভাই। ড. শামস্ মূলত লন্ডনের বাসিন্দা, লন্ডনেই ওনি পিএইডি করেছেন। আর তার ছোট ভাইও মাত্রই লন্ডন থেকে এমবিএ শেষ করে ভাইয়ের সংগে দেশে ফিরেছে।
 
বৃটিশ টেলিকম এর একজন রিটায়ার্ড ডিরেক্টর ড. শামস্ কে পাঠিয়েছেন বাংলাদেশে নতুন একটা ব্যবসায়ের সম্ভবনা খতিয়ে দেখতে- ব্যবসাটা নাকি খুবই লাভজনক।
 
সেই মিটিং এ ১ জন রানিং ‘সেক্রেটারী’ তার ছেলেকে নিয়ে এসেছে লেকচার শুনতে, এছাড়া আরও কয়েকজন রথি-মহারথীসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
 
আমিও লেকচার শুনতে লাগলাম।
ড. শামস্ বলছিলেন, ‘এটা এমন এটা প্রযুক্তি যা দিয়ে আমেরিকা-কানাডায় মাত্র ২৮ টাকা মিনিটে কল করা যাবে। মিডিলইষ্ট এ ৫০ টাকার মতো খরচ হবে। আপনারা আমার এই সেবাটি মার্কেটিং করবেন এবং ১০% কমিশন পাবেন।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
অনেকেই খুবই উচ্ছসিৎ। কয়েকজন খুবই আগ্রহ নিয়ে বিভিন্ন রিলেটেড প্রশ্ন করে যাচ্ছে। ড. শামস্ও হাসিমূখে উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন; প্রয়োজনে ছোট ভাইয়ের সাপোর্ট নিচ্ছেন।
 
আমি শুনছি।
কিন্তু কোন প্রশ্ন করলাম না।
 
মিটিং শেষ।
এক এক করে সকলে বিদেয় নিলেন।
 
ড. শামস্ আমার সংগে পরিচিত হলেন।
আমাকে বললেন, ‘তো মামা, আপনি তো কোন প্রশ্ন করলেন না?’
 
আমি ব্যারিষ্টার মওদূদ ষ্টাইলে মৃদু হাসলাম। তারপর বললাম, ‘মামা, আমাকে ১০ মিনিটের জন্য আপনার কমপিউটারটা একটু ব্যবহার করতে দেবেন- যদি তাতে ইন্টারনেট কানেকশন থাকে?’
ভদ্রলোক কৌতহলী হয়ে বললেন, ‘অবশ্যই’।
 
আমি ওনার ডেক্সটপে হটমেইল এর এমএসএন মেসেনঞ্জার এবং ইয়াহু মেসেনঞ্জার দু’টো ডাউনলোড করে ইষ্টটল করে নিলাম। ড. শামস্ কে বললাম, ‘মামা, আমেরিকার কোন একটা নাম্বার যদি থাকে- আমাকে দেন আপনাকে কথা বলিয়ে দিচ্ছি, এক টাকাও বিল আসবে না।’
 
ড. শামস্ কিছুটা বিব্রত, উত্তেজিত এবং কৌতুহলী হয়ে বললেন, ‘মানে? ফ্রি কথা বলিয়ে দিবেন?’ অতপর তার বিলেত ফেরত এমবিএ করা ছোট ভাইকে প্রশ্ন করলেন, ‘ইজ দিস পসিবল? হোয়াট হি ইজ সেইং?’
এমবিএ ছোট ভাই আমার দিকে বিদ্রুপের হাসিতে ইংগিত করে এবং তাচ্ছিল্লের স্বরে বললো, ‘ইমপসিবল’।
 
এবার ড. শামস্ আমাকে একটা আমেরিকার নাম্বার দিলেন। আমি সেটাকে কানেক্ট করিয়ে দিলাম ইয়াহু দিয়ে এবং বললাম, ‘মামা, ১৮ মিনিট পর লাইনটা কেটে যাবে, অতপর আবারও ১৮ কথা বলা যাবে- এভাবে যতবার খুশী আমেরিকার যে-কোন নাম্বারে আপনি চাইলে ২৪ ঘন্টাই কথা বলতে পারবেন। ওপ্রান্তে রিং হচ্ছে- নিন কথা বলেন’। বলে ওনার হেডসেট-টা কানে লাগাতে বললাম।
 
ড. শামস্ ৫/৬ মিনিট কথা বলে ফোন রেখে দিলেন।
এবার আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘মামা, কিভাবে করলেন এটা? ছোট এমবিএ করা ভাইকে ধমকের স্বরে বললেন- ‘তুমি তখন কি বললে আমাকে? খবর না জেনে- না বুঝে ইমপসিবল বলো কিভাবে?’
 
আমি ফিরে আসলাম।
এবং পরদিন দুপুরে ড. শামস্ আমার মোবাইলে কল দিলেন, ‘মামা, আমি একটু আপনার অফিসে আসবো আপনার সংগে কথা বলতে- কখন সময় দিবেন মামা?’
 
যাই হোক।
আমি যে গল্পটা বললাম সেটা বাংলাদেশের ‘ভিওআইপি’ শুরুর গল্প।
আমি ভিওআইপি সম্পর্কে কিছু বলতে চাচ্ছি না। ভিওআইপির পেছনের একটা গল্প বলতে চাচ্ছি। ‘বিহাইন্ড দ্য ষ্টোরি’ বলতে পারেন।
 
আমার একটা সমস্যা হলো, আমার মাথার চিন্তাগুলি সবসময় ‘রুট’ এ যেতে চায়; যে-কোন কিছুরই রুট খুঁজতে আমার আনন্দ লাগে খুব।
 
আমি ঐ সময়টাতে এওএল বা আমেরিকান অনলাইন এর ম্যাসেঞ্জার এ চ্যাট করে অনেক বন্ধু তৈরী করে ফেলি এবং তাদের সংগে ইয়াহু আর এমএসএন মেসেঞ্জার ব্যবহার করে আমেরিকান নাম্বারগুলিতে কথা বলতাম।
 
আমি ভিওআইপি-টা কি সেটা বুঝি কিন্তু আমার মাথায় যে প্রশ্নটা ঘুরপাক করতো তা হলো ‘ফ্রি কল’ এর রহস্যটা কি? কারণ আমার মাথায় কাজ করতো ‘বাংলাদেশী চিন্তা’। আমি তখনও বিলো টুয়েন্টিফাইভ। আমার চিন্তা তখনও বাংলাদেশী পরিবেশ, আবহাওয়া আর ইন্ফাস্ট্রাকচার কেন্দ্রিক। ভ্রমণের দৌড় পুরো বাংলাদেশ ঠিকই কিন্তু দেশের বাইরে বলতে ইন্ডিয়া আর নেপালে মাত্র কয়েকবার ঘুড়েছি। এই অতি সামান্য ‘জ্ঞান’ নিয়ে আমেরিকার সেই ‘ফ্রি কল’ এর রহস্যটা উদঘাটন সত্যিই অসম্ভব ছিল তখন। আমার মাথায় ছিল ফোন কল মানেই তো ‘মিনিট প্রতি বিল’!
 
টেলিকমিউনিকেশন এর উপর তখন আমার প্রবল নেশা। সেই সময়টাতেই পিএবিএক্স থেকে শুরু করে এমপস, জিএসএম, সিডিএমএ, ইউএমটিএস, টুজি, থ্রিজি, পিকোসেল, থুরাইয়া স্যাটেলাইট মোবাইল ইত্যাদি সবকিছু গিলে হজম করে ফেলেছি। সে সময়েই একটা প্রজেক্ট নিয়ে ‘একটেল’ এর এমডি দাতো ইবনে আব আজিজ এবং তার টেকনিক্যাল টিম এর সংগে বেশ কয়েকটা মিটিং হয় আমার; সেই মিটিং থেকে এমডি দাতো আজিজ আর জিএম হাসান এর সংগে ঘনিষ্ঠতা। ওনারা মানতেই রাজী নয় যে আমি বিদেশে পড়াশোনা করা ‘টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার’ নই! নইলে এতো কিছু কিভাবে জানা সম্ভব?
 
যাই হোক। তার বছর খানেক পর গেলাম হংকং।
চুংকিং ম্যানশনের ১১ তলায় আমার অতি ছোট হোটেল রুমে একটা ‘ফোন’ ছিল। আমার বাংলাদেশীয় ধারণায় সেটা অবশ্যই ‘ইন্টারকম’ হবার কথা। আমি রিসিপ্টশনে জানতে চাইলাম হংকং এ ‘লোকল কল’ করতে কত চার্য হবে এবং কিভাবে করতে হবে লোকল কল? আমাকে বলা হলো ‘তুমি সরাসরি কল করো- কোন বিল হবে না’।
 
আমি একটু অবাক হলাম, এটা কিভাবে সম্ভব! তারপর ইভান’কে কল করলাম। সে আমাকে তার লোকেশন জানালো কিভাবে যাবো ইত্যাদি। আরেক বন্ধুর ফোন নাম্বার নিয়ে গিয়েছিলাম, তার মোবাইলেও কল দিলাম- কথা বললাম অনেকক্ষন।
 
না। কোন বিলের বালাই নেই।
আমেরিকার ফ্রি কলের রহস্য বুজতে শুরু করেছি।
কিন্তু অন্য একটা বিষয় জট পাকাচ্ছে। হংকং তো পিচ্চি একটা দেশ, ঢাকা শহরের চেয়েও ছোট। কিন্তু আমেরিকা তো বাংলাদেশের ১০০টার চেয়েও বড়। এত বড় দেশে কিভাব ফ্রি কল করা সম্ভব। অপারেটররা কিভাবে ব্যবসা করবে? মাথা গুলিয়ে গেল।
 
দু’বছর পর গেলাম সিংগাপুর।
সেখানেও একই ব্যবস্থা। হোটেল থেকে দিনরাত ল্যান্ড, মোবাইলে কথা বলি- বিলের কোন ঝামেলাই নেই। কয়েকবার সিংগাপুর চাংগিতে ট্রানজিট নিলাম। ইমিগ্রেশনের ভেতরেই রয়েছে ফ্রি ফোনের সুবিধা। আমিও চুটিয়ে কথা বলতাম পরিচিতজনদের সংগে।
 
বিল নেই তো সমস্যাও নেই।
 
এবার আসি আমেরিকায়। আমেরিকা পাগলের দেশ।
লাইকা মোবাইল নামের একটা অপারেটর রয়েছে এদেশে। লাইকা কিন্তু মেইন অপারেটর না। এদেশে মেইন অপারেটর থেকে নাম্বার ও কল কিনে আপনি নিজেও একজন মোবাইল অপারেটর বনে যেতে পারেন; এদের বলা হয় এমবিএনও বা (Mobile Virtual Network Operator)। লাইকা ইওরোপ, অষ্ট্রেলিয়াসহ আরও প্রায় ২১টি দেশে মোবাইল অপারেটর হিসাবে কাজ করছে। লাইকার মূল মালিক একজন শ্রী লংকান মুসলিম, নাম সবাসকারণ আলীরাজা।
 
এই লাইকা মোবাইল থেকে মাসিক মাত্র ২৯ ডলারের একটি প্লান নিলে ৩০দিন আনলিমিটেড আমেরিকায় লোকাল কল এবং বাংলাদেশ, কানাডা, মেক্সিকো, ইন্ডিয়া, চায়নাসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশের ল্যান্ড বা মোবাইল ফোনে ২৪ ঘন্টা আনলিমিটেড কথা বলা যায়। ফ্রি ইন্টারন্যাশনাল টেক্সট ম্যাসেজ পাঠানো যায়, আমেরিকায় আনলিমিটেড ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায়।
 
আমি কি বললাম- বুঝতে পেরেছেন? উপরের প্যারাটা আরেকবার পড়েন।
‘এই লাইকা মোবাইল থেকে মাসিক মাত্র ২৯ ডলারের একটি প্লান নিলে ৩০দিন আনলিমিটেড আমেরিকায় লোকাল কল এবং বাংলাদেশ, কানাডা, মেক্সিকো, ইন্ডিয়া, চায়নাসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশের ল্যান্ড বা মোবাইল ফোনে ২৪ ঘন্টা আনলিমিটেড কথা বলা যায়। ফ্রি ইন্টারন্যাশনাল টেক্সট ম্যাসেজ পাঠানো যায়, আমেরিকায় আনলিমিটেড ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায়।’
 
আমি আমেরিকার সেই দিনের সেই ‘ফ্রি কল’ এর রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হলাম।
 
কিন্তু কেন? কেন এত চিপ কল রেট এদেশে?
আমেরিকা পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল একটা দেশ।
এদেশে একজন মানুষ গড়ে মাসে ৮,০০০ ডলার আয় করে। এই দেশে রেষ্টুরেন্টে এক বেলা অতি সাধারণ খাবার খেতে ১৫ ডলার ব্যয় হয়। একবার ট্রেনে লোকাল রাইড এর মূল্য ৩ ডলার। অথচ সেই দেশে ফোন কল এতটা চিপ কেন?
 
আরও একটা খবর শুনেন। যাদের বার্ষিক আয় ২৭ হাজার ডলারের কম- তাদের জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামা ‘ফ্রি ওবামা ফোন’ দিয়ে রেখেছেন। মোবাইল সেটও ফ্রি, সারাবছর কলও ফ্রি। কাউকেই কোন টাকা দিতে হবে না। যত খুশী কথা বলেন এবার।
 
কেন?
এই কেন’র উত্তরটা খুবই সহজ।
তবে, উত্তরটার জন্য আরেকটু গভীর যেতে হবে।
 
রাষ্ট্রের সংগে জনগণ এর সম্পর্ক কি? অতি সহজ সরল হিসাব যদি করি তাহলে দাঁড়ায়- ‘রাষ্ট্রপতি হলো পিতা আর জনগণ হলো সন্তান’।
 
‘ষ্টেপ-ফাদার’ হলে হবে না আসল পিতা হতে হবে।
 
পিতা’র কাজ হলো প্রত্যেকটা সন্তানকে একই নজরে দেখা এবং তাদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে যা যা করা দরকার তাই করা। প্রয়োজনে নিজে না খেয়ে হলেও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেয়া।
 
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট তার জনগণ এর জন্য পিতার দায়িত্ব পালন করেন। জনগণ যদি ‘অতি সহজে’ যোগাযোগ না করতে পারে তাহলে কিভাবে সে আয় করতে পারবে? কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
 
আর, অপরদিকে বাংলাদেশের ‘সরকার প্রধান’ হলো জনগণ এর ষ্টেপ-ফাদার। মানে সৎ বাবা। তার আপন সন্তান হলো সজীব ওয়াজেদ জয় যার বিনা কাজে মাসিক বেতন ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা আর বাকী জনগণ বা সৎ ছেলেমেয়েরা না খেয়ে থাকবে। কোন আয় করলো কি করলো না তাতে প্রধানমন্ত্রীর কি এসে যায়?
 
আর এজন্যই এই দেশে থ্রিজি লাইসেন্স পেতে একটা অপারেটরকে ইনভেষ্ট করতে হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। সেই হাজার হাজার কোটি টাকা থেকে অটিজম সজীব ওয়াজেদ জয়ের মাসিক বেতন ঠিকই হয়ে যায়, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকাও চলে আসে কিন্তু জনগণকে যোগাযোগের জন্য খরচ করতে হয় মাসে কমবেশী ৩ হাজার টাকারও বেশী শুধু একটু লোকল কথা বলতেই। ইন্টারনেট, ফরেন কল ওসব আরও পরের হিসাব।
 
আরেকটা মজার হিসাব দিই।
বাংলাদেশে যারা মোবাইল রিচার্জ বা ফ্লাক্সিলোড এর ব্যবসা করে- তারা ৩% কমিশন পেয়ে থাকে। আর একটা নতুন কানেকশন সেল করলে মনে হয় না আহামরি কিছু আয় করতে পারে।
কিন্তু, এই আমেরিকার লাইকা মোবাইল এর একটা নতুন কানেকশন ২৯ ডলারের মাসিক প্লান সেল করতে পারলে কোম্পানী তার বিক্রেতাকে ৪৫ ডলার প্রদান করে থাকে।
 
২৯ ডলার সেলে ৪৫ ডলার লাভ!
ভাবুন এবার এটা কোন পাগলের দেশ?
 
এটাই ব্যবসা।
বাংলাদেশ কি আদৌ কোনদিন এই তার জনগণকে ‘এই’ ব্যবসা উপহার দিতে পারবে? আর যতদিন না পারবে- ততদিন দেশের ছেলেরা বেকার থাকবে। চুরি করবে। রাজনীতি করবে। ফাইনালী দেশটা আরোও ধ্বংশ হতে থাকবে।
 
শুরুটা ভিওআইপি নিয়ে করেছিলাম।
ভিওআইপির দু’একটা কথা বলি। কবে যেন খবরে দেখলাম তারানা হালিম অবৈধ ভিওআইপি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। ওনি যে ব্যর্থ হবেন সেটা তো অামি বহু আগেই বলে রেখেছিলাম। কারণগুলিও খুবই সাদা-মাটা।
 
ভিওআইপি টা হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে কল আদান-প্রদান। খুবই সহজ একটা টেকনোলজী। আপনার ফোনে ইন্টারনেট আছে এদিকে আমারও ইন্টারনেট আছে- আমরা দুজনে কথা বলবো- দ্যাটস ইট। আলাদা করে খরচের কোন বালাই নেই এখানে।
 
কিন্তু আপনি যদি সেই কলটা মোবাইলে করতে চান- তাহলে আপনার বাড়তি মোবাইল কল রেট-টা এড হবে। আমেরিকায় যেহেতু ফোন কলে টাকা লাগে না- সেহেতু সারা বিশ্ব থেকেই আমেরিকায় হাফ সেন্ট এরও কমে মিনিট প্রতি ভিওআইপি কথা বলা যায়।
 
আমাদের পাশ্ববর্তী ভারত সরকার বিষয়টা অনেক আগেই ধরে ফেলে। আমি আগেই তো বলেছিলাম যে ভারত সবকিছুতেই চেষ্টা করে আমেরিকাকে ফলো করতে। বিশ্বের যে-কোথাও থেকে ভারতেও ভিওআইপি কলে ১ সেন্টের কমে কথা বলা সম্ভব।
 
হিসাবটা হলো, যখনই নামমাত্র মুল্যে কথা বলার সুযোগ থাকবে- তখন আর ওতে অবৈধভাবে পয়সা আয়ের কোন সুযোগ থাকে না। সরকারকে চিন্তা করতে হবে- জনগণের কথা। কিন্তু সরকার যদি নিজেই ইনকাম করতে চায়, তাহলে জনগণের কথা ভাববে কখন? মুলতঃ ভাবেও না। ভাবার সময়ও পায় না।
 
বাংলাদেশ ভিওআইপির এই মুহুর্তের রেট সম্ভবত ৩ সেন্ট বা আড়াই সেন্ট। এই টাকাটা ভাগ করে খায় বিটিআরসি বা সরকার, অপারেটর, আইজিএক্স, সহ মোট তিন স্তরে। ৩ সেন্ট বর্তমান বিশ্ব বাজারের হিসাবে অনেক টাকা। অপর দিকে বাংলাদেশে মিনিট প্রতি ৫০ বা ৬০ পয়সায় কথা বলা যায় যার ইউএসডি ভ্যালু ১ সেন্টেরও কম। সুতরাং এখানে ২ সেন্টের একটা ব্যবসা রয়ে গেছে। এই ফাঁকটা-ই হলো অবৈধ ব্যবসার আকর্ষন।
 
সুতরাং বাংলাদেশে অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। ভিওআইপির রেট ১ সেন্টের নীচে নামিয়ে আনুন। এতে দেশের মানুষের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ খরচ কমে যাবে এবং অবৈধ ব্যবসার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
 
এই সামান্য বিষয়টুকু বুঝার জন্য ‘মহাজ্ঞানী হতে হয় না’।
 
আমার প্রশ্ন কিন্তু অন্যত্র।
বাংলাদেশ সরকার কোনদিনও দেশের জনসাধারণ এর জন্য কোন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়নি বা দিচ্ছে না।
 
ওয়ান এলেভেন এর ‘তত্ববধায়ক বেকুব সরকার’ অবৈধ ভিওআইপি বন্ধের নামে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকায় লাইসেন্স বিক্রি করে সরকারের রেভিনিও এনে দিয়েছে এবং পরিণামে দেশের লাখ লাখ বেকার কিন্তু উদ্দোমী তরুণকে একটা চমৎকার ব্যবসার সুযোগ থেকে লাথি মেরে দুরে ফেলে দেয়া হয়েছে। কিছু পয়সাওয়ালা মানুষকে আরও পয়সা আয়ের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র।
 
ভিওআইপির মাধ্যমে বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণকে আয়ের পথ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জনসাধারণের দিকে কোনদিনও কোন সরকার বাংলাদেশে ফিরেও তাকায়নি।
 
আরও একটা চমৎকার ব্যবসায় দেশের তরুণরা অগ্রনী ভূমিকা পালন করে নিজ নিজ কাজে ভালো ফরেন রেমিটেন্স আয় করার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে বড় বাধা। সেটা আউটসোর্সিং। আমেরিকান কোম্পানীগুলির কাজ ঢাকায় বা রিমোটে বসে করে দেয়া। ভাল একটা অায়ের সুযোগ রয়েছে এখানে, অনেকে করেও যাচ্ছে। কিন্তু এতেও সরকারের বাঁধা।
 
আয়কৃত টাকাটা আনতে বা ছোট ছোট বিড করতে কিছু টাকা বিদেশে পাঠানোর কোন বৈধ রাস্তা সরকার দিচ্ছে না। জনগণকে নিয়ে এটুকু ভাবার কোন সময় সরকারের হাতে নেই। সরকার সামান্য একটু সহায়তা করলে বাংলাদেশের মিনিমাম ১ কোটি তরুন আউটসোর্সিং করে মাসে এক থেকে দুই হাজার ডলার আয় করতে পারতো। কেউ কেউ ২৫ থেকে ৩০ হাজার ডলারও ঢাকায় বসে ইনকাম করতে পারে।
 
কিন্তু সরকার তা করতে দেবে কেন? ওতে তো সজীব ওয়াজেদ জয়ের কোন লাভ হবে না? তার একাউন্টে তো কোন টাকা যাবে না! সুতরাং দরকারটা কি? সরকারের তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা বলে কথা!
 
ব্যবসা সবসময়ই ব্যবসা। এটা বুদ্ধির খেলা। সময়ের খেলা।
 
সিংগাপুর, মালয়েশিয়া আর মিডিলইষ্টে গোল্ডবারের মুল্য কম। বাংলাদেশে একটু বেশী, ভারত আরও বেশী। কিছু তরুণকে দেখতাম মালয়েশিয়া যেয়ে ১ টা বা ২ টা করে গোল্ডবার কিনে নিয়ে আসতো। এয়ারপোর্টে সরকার নির্ধারিত আড়াই হাজার টাকা ট্যাক্স দিত। সম্পূর্ণ বৈধভাবে, আইন মেনে ঐ গোল্ডবারগুলি দেশে আসতো। ইন্ডিয়ানরা দেশে এসে সেই গোল্ডবারগুলি আরও বেশী দামে কিনে নিয়ে যেত।
 
এতে বিনিয়োগ, বিমানভাড়া, ট্যাক্স সব মিলিয়ে গোল্ডবার প্রতি প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতো অনেকেই। হাজার হাজার তরুণ সেই ব্যবসাটা শুরু করে।
 
কিন্তু শেখ হাসিনা তা করতে দেবে কেন? সে বার প্রতি ট্যাক্স আড়াই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করে দিল ৫১ হাজার টাকা।
 
দেশের মানুষের টাকা অায় করে কি হবে? বাংলাদেশের মানুষ তো গরু-ছাগুল। এগুলি মরুক। প্রয়োজনে রাব পুলিশের ক্রস ফায়ারে দিয়ে হলেও মরুক।
 
মানুষ যখন বৈধ রাস্তা না পায়- তখনই অবৈধ রাস্তা খুঁজে।
আর এই অবৈধ রাস্তায় যখন বড় বড় গোল্ডের চালান নিয়ে আসে তার থেকে প্রতি মাসেই দু’চারটা বড় চালান বিমান বন্দরের কাষ্টমসের হাতে ধরা পরে।
 
মজার প্রশ্নটা হলো- ঐ আটককৃত বড় বড় গোল্ডবারগুলি শেষ-মেশ কৈ যায়?
কেউ কি বলতে পারেন?
না। বলতে পারবেন না। কারণ বাংলাদেশের সরকারী আমলা-কমকর্তা-কর্মচারীরা ওগুলি ভাগ-জোগ করে খেয়ে ফেলে। কোন রাজস্ব হিসাবেও ওসব পাবেন না। আর যদি পানও পরীক্ষা করলে দেখবে- ততদিনে ওই অরিজিনাল গোল্ডবারগুলি বদল হয়ে ‘প্লাষ্টিক বার’ হয়ে বসে রয়েছে!
 
দেশের জনগনের কোন ব্যবসার দরকার নেই।
ওগুলি না খেয়ে মরুক। কার কি?
 
উন্নত বিশ্বের সংগে পাল্লা দিয়ে ঢাকায়ও নাকি শুরু হয়েছে ‘উবার’ এর ব্যবসা।
অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং চমৎকার একটি সংযোজন ঢাকাবাসীর জন্য।
 
কিছু তরুণের আয়ের রাস্তা হতে পারতো। সংগে অত্যাধুনিক সেবাও পেত মানুষ।
কিন্তু এতে ‘বাংলাদেশ সরকার’ এর কি লাভ?
 
আর তাই, আজই বিআরটিএ’র একটা বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়লো।
তাদের ‘ব্যাকরণিক ভাষা’য় বক্তব্য হলো ‘উবার’ সেবাটি বে-আইনী।
খুবই ভালো একটা বিজ্ঞপ্তি।
 
বাংলাদেশের ঐ ‘আবাল’ সরকর প্রধান আর আমলাগুলি এরচে ভাল কি কিছু করতে পারবে? ওরা পারবেই যে কোন ভাল উদ্যোগকে ধ্বংশ করে দিতে- কোন কর্মসংস্থানের সুযোগ ওরা দেশের মানুষদের দিয়েছে কোনদিন?
 
উদ্দোগী প্রতিষ্ঠানটিকে একটা ফি ধার্য করে অনুমতি দিয়ে দিলেই হয়ে যায়- কিন্তু তা করতে যাবে কেন- আমাদের ‘আবাল আমলা’ আর ‘ষ্টেপ-মাদার সরকার’?
 
দেশের মানুষগুলি সব মরুক।
en.pdf24.org    Send article as PDF