ইমপোর্ট বিজনেস

সেটা ২০০৪ সাল।
 
জীবনের প্রথমবার ইমপোর্ট বিজনেস শুরু করবো।
আমার ফর্টিন জেনারেশনের মধ্যে কেউ বিজনেসম্যান নেই। নিজের ইচ্ছায় ব্যবসা শুরু করি। বয়স তখনও ত্রিশের নিচেই। অভিজ্ঞতাও কম। বাংলাদেশের একটি মোবাইল অপারেটর ৫০০ পিস টেলুলার নিবে (টেলুলার মানে ফিক্সড ওয়ারলেস টার্মিনাল)। কোরিয়ান একটা ম্যানুফ্যক্চারের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করলাম। রিলায়েবল মনে হলো। ২টি স্যাম্পলের জন্য তাদের ৫৫০ ডলার পাঠাতে হবে; তারা তাদের কোম্পানীর ব্যাংক একাউন্ট দিল। টাকা পাঠালে তারা স্যাম্পলগুলি আমার ডিএইচএল একাউন্টে ড্রপ করে দেবে।
 
জীবনের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস; সিদ্ধান্ত নিলাম ১০০% অনেষ্টি বজায় রেখে করবো।
 
এবং প্রথম ধাক্কাটাই খেলাম পরদিন।
আমি তখন ব্যাংকিং করি ন্যাশনাল ব্যাংক কাউরান বাজার শাখায়। গেলাম, ম্যানেজার সাহেবকে বললাম কোরিয়াতে ৫৫০ ডলার পাঠাতে হবে। আমার তো একাউন্ট আছে- কিভাবে পাঠাবো; নতুন ব্যবসা একটু সহযোগীতা করেন।
 
ম্যানেজার সোজাসাপটা উত্তর দিলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাঠানো যাবে না; নিয়ম নাই। তিনি আমাকে কোন রাগ-ঢাক ছাড়াই বলে দিলেন, হুন্ডি করে পাঠান। আমি উত্তর দিলাম, এটা জানার জন্য তো অাপনার কাছে আসি নি; ওটুকু আমিও জানি।
 
এইচএসবিসি ব্যাংকে গেলাম। ওরা বলল, আমরা বিদেশী ব্যাংক হলেও বাংলাদেশের আইনে বন্দি। বাংলাদেশ থেকে কোন টাকা বিদেশে পাঠানো যাবে না; শুধুমাত্র ছাত্রদের টিউশন ফি ছাড়া।
 
আমার সমস্যা হলো, আমি কখনওই হাল ছারি না। পরদিন আমার ম্যানেজারকে পাঠালাম বাংলাদেশ ব্যাংকে। ম্যানেজার কোন এক এডি’র সাথে কথা বলে একটা আইনের পাতার ফটোকপি নিয়ে ব্যাক করলো। সেখানে যে আইনী ভাষা লেখা রয়েছে তা মনে হয় স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও বুঝবে না।
কিন্তু আমিতো আমিই। টাকা আমি বৈধভাবেই পাঠাবো; জীবনের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বলে কথা।
 
আমার এক সিনিয়র বন্ধু আলাউদ্দিন ভাই। ভদ্রলোক তখন অগ্রণী ব্যাংক সেন্ট্রাল ল’ কলেজ শাখার চার্জে। ওনি সব শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আপনি যতটা নাছোরবান্দা, এবং আপনাকে আমি যতটুকু চিনি; আপনি টাকা পাঠাতে পারবেন। তবে এজন্য কম করে হলেও একমাস সময় লাগবে প্রয়োজনীয় অনুমতি পেতে এবং আপনার নিজেকেই প্রচুর দৌড়াদৌড়ি করতে হবে; মনে রাখবেন- সরকারী অফিসে যে টেবিলে ফাইলটি থাকবে, ওখান থেকে একা একা কোনদিনই নড়বে না; যদি না আপনি নিজে না দৌড়ান।’
 
আমি রাজী।
টাকা আমি বৈধ ভাবেই পাঠাবো।
 
ম্যানেজার সাহেব তার বরাবার আমার কোম্পানীর লেটার হেডে একটি ফরোয়ার্ডিং দিতে বললেন সাথে ইনভয়েসের কপি। দিলাম। তিনি ফরোয়ার্ড করে দিলেন তার হেড অফিসে। এই কাজটুকু ঐদিনই কপ্লিট করে হেড অফিসে রিসিভ করালাম। হেড অফিস বলল কাল আসেন।
 
পরদিন গেলাম; আজ ঐ অফিসার নেই, কাল ঐ অফিসার নেই। প্রতিদিনই যাই; আমার ফাইল এগোয় না। ডিএমডির সাথে দেখা করলাম। তাকে সরাসরি বললাম, হুন্ডি করবো না। বৈধ রেমিটেন্স করবো। উনি অামার অনড় অবস্থা দেখে আমার চিঠিটি সাথে ওনার একটা ফরোয়ার্ডিংটি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন রেমিটেন্স বরাবার রেডী করে দিলেন; তাও লেগে গেল আরও সপ্তাহ খানেক।
 
যাই হোক, এবার বাংলাদেশ ব্যাংক। রিসিভ করালাম। একজন এডি সাহেবের সাথে বিস্তারিত কথা বললাম। উনি সব শুনে বললেন আগামী মাসে যোগাযোগ করেন।
 
আমি তাকে স্পষ্টভাবে বলে দিলাম, আগামী মাসে নয়, আগামী কাল আসবো, আপনি না পারলে যে পারবে তার টেবিল দেখিয়ে দিন; আমিই যা করার করবো। অনেক তর্কাতর্কির পর সে এক সপ্তাহ সময় নিল। গেলাম পরের সপ্তাহ। এখানেও আজ ‘এ’ নেই কাল ‘ও’ নেই। চলল।
 
আমি রিতিমত বিরক্ত। সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে মাসখানে এটা নিয়েই দৌড়াচ্ছি। মেজাজও গরম কিন্তু হাল ছাড়বো না।
 
তারপর একদিন এডি সাহেব বলল, হবে না; কেউ অাপনাকে পার্মিশন দেবে না।
 
আমি প্রশ্ন করলাম কে দিবে না?
উত্তরে বলল, ডেপুটি গভর্ণর স্যার।
আমি বললাম, আমি তার সাথে কথা বলব।
তাকে তো পাওয়া যাবে না; খুব ব্যস্ত।
আমি স্পষ্ট ভাষায় বললাম, আমিও ব্যস্ত এবং আপনাদের উচিৎ আমাদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকা। সে যত ব্যস্তই থাকুন, তাকে বলুন আমাকে সময় দিতে হবে; আমি কথা বলব।
 
অবশেষে, পরদিন সকাল নয়টায় আমাকে সময় দেয়া হল; ডেপুটি গভর্ণর আমাকে সময় দিবেন।
 
আমি গেলাম নিজেই আমার ফাইল হাতে করে; ইতিমধ্যে অামার ফাইলটি অনেক মোটা-পুরিপুষ্ট হয়ে গেছে।
 
ভদ্রলোক গম্ভীরভাবে বললেন, দেখেন বিদেশে টাকা পাঠানো যাবে না।
আমি বললাম, তাহলে আমরা যারা নতুন ইমপোর্ট বিজনেস করবো, তারা স্যাম্পলের জন্য কিভাবে টাকা পাঠাবো?
উনি বললেন, কি আর করবেন; আমাদের কিছুই করার নাই। যে-ভাবে হোক পাঠান।
আমি বললাম, ওকে; থ্যাংক ইউ। এই কথাটাই আপনি একটু কষ্ট করে আমার ফাইলে লিখে দিন; আমি চলে যাব। আর যদি না লেখতে পারেন তবে আমাকে পারমিশন না দেয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ব না। আমাকে চাইলে আপনি যা খুশি করতে পারেন। তবুও আমি হুন্ডি করবো না। বৈধভাবে প্রথম ব্যবসাটি করবো।
 
কালো মতন ভদ্রলোকের চেহারা আরও কালো হয়ে গেল। ১ মিনিট চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আপনাকে আমি পার্মিশন দিলাম। বাট, বাকী জীবনে আর কোনদিন এই রিকোয়েষ্ট নিয়ে আর আসবেন না প্লিজ।
 
আমি পার্মিশন পেলাম; টোটাল প্রায় ১ মাস সময় নষ্ট হল আমার। পরদিন ৫৫০ ডলার কোরিয়াতে পাঠালাম।
 
তারপর গত ১০ বছরে অনেক অনেক বার হুন্ডি করে বিদেশে টাকা পাঠিয়েছি; ব্যবসা করে তো খেতে হবে। ইন্টান্যাশনাল হুন্ডির লাইন আমার মুখস্ত- আমাদের মহান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আনুকুল্যে।
 
যাক। যা বলছিলাম।
 
এখন রাত দেড়টা। চায়নাতে ৫২০ ডলার পাঠাতে হবে। আজ শনিবার কাল রবিবার উইকএন্ড- আমি যদি আজ চাইনিজ টাইম বিকেল ৩টার মধ্যে টাকা পাঠাতে পারি তাহলে আজই ওরা আমার স্যাম্পলটি শিপমেন্ট করে দিবে; কাল হংকং থেকে ফ্লাইট ধরে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে আমি নিউ ইয়র্কে বসে হাতে পাব। রাত দেড়টা।
 
আমেরিকাতে শুধামাত্র ম্যাকডোনালস, ওয়ালমার্ট, কুগারই নয়, ওয়েষ্টার্ণ ইওনিয়নও ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে। আমি বাসা থেকে পোনে দুইটায় বের হলাম; প্রায় এক মাইল দুরে যেতে ৫২০ ডলার রেমিটেন্স করলাম। চায়নাতে টেক্স করলাম এমটিসিএন নাম্বারটি; বাসায় ফিরে আসলাম। কাজ হয়ে গেল। এক ঘন্টা সময় লাগল।
 
আমার পে-পল ছিল; কিন্তু চাইনিজ কোম্পানীটি পে-পল এক্সসেপ্ট করে না- তাহলে ১ মিনিটেই হয়ে যেত কাজটি; আমাকে বাইরেও যেতে হত না।
 
এটা হল আমেরিকা।
আর আমাদের বাংলাদেশটা হল  …!
 
www.pdf24.org    Send article as PDF