রেড গ্রীন দেশপ্রেম

এইতো সেদিনও বেশ কয়েকজনই আমাকে বললেন, আপনি যেভাবে স্ট্যাটাস দেন- তাতে অনেকেরই গায়ে লাগে। এতে তো আপনার ফলোয়ার কমে যাবে!
 
তখনই মাথায় চিন্তাটা আসলো- আচ্ছা, আমি কি কখনও ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য কোন স্ট্যাটাস দিয়েছি? সত্যি বলছি আমি খুঁজে পাইনি।
 
আমি যে-কোন বিষয়ে লিখতে গেলে আগে সেটা চতুর্মূখী পর্যবেক্ষন করি এবং বোঝার চেষ্টা করি সমস্যাটার উৎপত্তি কোথায়। এবং সমাধানের সম্ভাব্য পথগুলি বের করার চেষ্টা করে আর্টিকেলটি শেষ করি।
 
আর এতে, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের ঘাড়েই শেষ পর্যন্ত দোষটি গিয়ে বর্তায়।
 
অর্থাৎ, অনেকের ধারণা- আমি না কি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লিখি।
সুতরাং একজন দেশবিরোধী লেখকের তো ফলোয়ারই থাকার কথা না।
 
তবে একটা মজার বিষয় আমার দৃষ্টিতে আটকে রয়েছে আর সেটা হলো- ফলোয়ারের তুলনায় আমার লেখায় রিয়েক্ট ও কমেন্ট এর অনুপাত অত্যন্ত বেশী। অর্থাৎ আমি নাড়া দিতে পারছি।
 
আমার লেখা যারা নিয়মিত পড়েন, তারা বেশ ভালোই জানেন যে আমি কাউকেই খুশী করার জন্য লিখি না।
 
ইভেন গতকাল যে একটা স্ট্যাটাস দিলাম যেখানে বললাম, ‘পরিবারের কেউ বিদেশী নাগরিকত্ব নিলে সে বাংলাদেশের কোন সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রিয় তথা প্রশাসনিক পদে আসতে পারবে না’। এটা কিন্তু একসময় হয়তোবা আমারও বিরুদ্ধেই যাবে।
 
আমি আমেরিকার নাগরিকত্ব পাইনি, তবে পাবো না- সেটাও না।
মানেটা হচ্ছে আমি শুধু দেশের বিরুদ্ধেই না, আমার নিজের বিরুদ্ধেও লিখি।
 
সম্ভবত এখানেই আমার স্বাতন্ত্র।
আমি নিজস্বতা এনজয় করি।
আমি গণমানুষের পক্ষে কথা বলে আনন্দ পাই।
 
আর আগেও বলেছি- আপনি যদি আপনার নিজের দোষটুকুই না জানেন তাহলে নিজেকে শোধনাবের কিভাবে? জানতে তো হবে যে আপনার দোষটা ঠিক কি?
 
আমি বাংলাদেশের দোষগুলি খুঁজে বের করি।
সেখানে আমি আমার নিজের, আমার পরিবারের, আমার কালচারের, আমাদের দেশের সংবিধানের, আমার দেশের মানুষের সমস্যাগুলি চিহ্নিত করি।
 
এবং সেখান থেকে বের হয়ে আসার পথ দেখাই।
 
এবং এটাকে যখন কেউ বলে আমি দেশের বিরুদ্ধে লিখি- তখন আমি হাসি। এ
বং তার চিন্তার দৈনতায় কষ্ট পাই। তার আত্ম-অহমিকায় ভীত হই।
দেশের ভবিষৎ নিয়ে আরও শংকিত হই।
 
একটা সামান্য বিষয়ও আমরা ঘোলা করে ফেলি যে, ‘আমিই দেশকে সবচে বেশী ভালবাসি।’
 
আবার কেউ কেউ দাবী করে বসে ‘তারা নিজেরাই শুধুমাত্র দেশকে ভালবাসে’ বাদবাকীরা নাকি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি!
 
কতটা নির্লজ্জ এবং মূর্খ হলে এসব ফালতু কথা গলা বাড়িয়ে বলতে পারে!
আমার ঘৃণার বমি চলে আসে ওদের কথাবার্তায়, ওদের চেতনাবাজিতে!
 
এদেশে জন্ম নেয়া, এবং এদেশের মাটিতে, আলো-বাসাতে বেড়ে উঠা প্রতিটি মানুষই তার নিজ মাতৃভূমিকে সম-ভাবে ভালোবাসে যদিও প্রকাশ ভংগি ভিন্ন হতে পারে।
 
একটা প্রশ্নের উত্তর কি কখনও খুঁজেছেন যে ‘দেশকে কিভাবে ভালবাসতে হয়?’
 
প্রফাইলে নিজের ছবিতে সবুজ লাল রং লাগালেই দেশপ্রেম হয়ে যায়!
জনগণের কষ্টের ট্যাক্সের ১০০ কোটি টাকা খরচ করে জাতীয় সংগীত গাইলেই দেশপ্রেম হয়ে যায়।
 
১৬ই ডিসেম্বর একযোগে টাইমলাইনে জাতীয় পতাকা টাংগালেই দেশপ্রেমের রেকর্ড হয়ে যায়?
 
২১শে ফেব্রুয়ারী ল্যাংটা পায়ে শহীদ মিনারে দাড়ালেই দেশপ্রেম হয়ে যায়!
 
‘দেশপ্রেম’ শব্দটিকে আপনারা যে ‘সস্তা বাজারে শব্দ’ বানিয়ে ফেলেছেন! এটা কি বুঝেন?
 
এই পৃথিবীর আর কোন দেশ বা জাতি রয়েছে যে এসব ফালতু, অপ্রয়োজনীয়, অলচ এবং গুরুত্বহীন ‘প্রচার’ চালিয়ে তথাকথিত ‘দেশপ্রেম’ প্রদর্শন করে!
 
এসব দেশপ্রেমের নামে নোংড়ামী আদতে দেশকে ইভটিজিং করারই শামিল।
এসব করে দেশের ঠিক কি উন্নতি হয় বলতে পারবেন?
 
এসব করে দেশের গরীব আয়-সহায়-সম্বলহীন ৭০% মানুষের জন্য কি একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন?
 
নাকি তাদের ‘হক’ এর টাকাটাকে নিজেদের নষ্টামীতে নষ্ট করে দেশকে ভালবাসা নয় বরং ধর্ষনের তৃপ্তি নিয়েছেন!
 
আচ্ছা আপনি যদি প্রতিদিন বাসায় গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার সদাই করার পরিবর্তে পরিবারের সকলকে ভালোভালো গান, লাল নীল সবুজ পতাকা আর তোমাদের ভালবাসি ভালিবাসি করে চিৎকার করতে থাকেন কিন্তু তাদের খাবারের, জামা-কাপড়ের, প্রয়োজনের সমং চিকিৎসার ব্যবস্থা না করেন- তাহলে তারা আপনার এই ‘ভালবাসা’ ‘পরিবারপ্রেম’কে লাথ্থি মেরে বের করে দিতে কয়দিন সময় নিবে বলতে পারেন?
 
যেটা আপনি পরিবারের সংগে করেন না সেটা ঠিকই দেশের সংগে করে যাচ্ছেন! এটাই তো আপনার দেশপ্রেম!
 
না। আমি এভাবে দেশকে ভালবাসি না।
তাই তো দেশপ্রেম দেখানোর কোন প্রয়োজনও কোনদিন প্রকাশ করিনি, করবোও না।
 
আপনাদের এতো এতো দেশপ্রেমের ফলেই তো আজ বাংলাদেশ একটা ডাষ্টবিনে পরিণত হয়ে রয়েছে- এখান থেকে কেউ বের করারও চেষ্টা করছে না।
 
আর আমি যখন একটু খোঁচা দিই, ধরিয়ে দিই- তখনই আমার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করেন!
 
আমি পরোয়া করি না- সেটা কিন্তু বুঝে গেছেন।
করবোও না কোনদিন- নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
 
দেশকে ভালবাসতে হলে দেশের জন্য আলাদাভাবে কিছুই করতে হয় না।
 
শুধুমাত্র একটু সৎ থাকুন, কর্মঠ হোন, কাজ করুন। পরিশ্রম করুন, আয় করুন। দেশকে ভালো-যোগ্য-সৎ-মেধাবী, দূরদর্শী নেতৃত্বের হাতে অর্পনে কাজ করুন। দেশের সকল মানুষ কিভাবে তাদের সম্মিলিত আয় বাড়াবে সেদিকে নজর দিন।
 
বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যখন বছরে মাত্র ১২ লাখ টাকা আয় করতে পারবে সেদিনই দেশ উন্নত হবে, দেশপ্রেম সফল হবে। মানুষের আয় বাড়ানোর কোন পরিকল্পনা নেই, দেশের ইনফষ্ট্রাকটারে কোন ডেভেলপমেন্ট নেই, সুশাসন নেই, বিচার বিভাগ ধ্বংশপ্রাপ্ত; সরকার নিজেই পাবলিক মানি লুটপাটে ব্যস্ত, পুলিশ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত- আপনি ঘুমাচ্ছেন আর ছবি সবুজ লাল কালারে রাঙিয়ে দেশপ্রেম দেখাচ্ছেন!
 
যত্তসব ফালতু কাজকর্ম।
 
আমার একজন ফলোয়ার গতকাল ফোন করলেন জার্মানী থেকে- তিনি একটা চমৎকার কথা বললেন, ‘আমাদের দেশে একজন লেখকও নেই- যে কিনা তার নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে একটি লাইনও লিখতে পারে! সবকিছুতেই তারা সর্বাগ্রে নিজের লাভ, নিজের স্বার্থ ভেবে তারপর আর্টিকেল লিখে!’
 
ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য হলেও নিজের পক্ষে লিখতে হয়, মানুষকে তৃপ্ত করার জন্য ভালো ভালো লাইন লিখতে হয়- কিন্তু আমি তা করি না; আমার রুচি আসে না।
 
তবে আমার ফলোয়ারদের অনেক কিছু ভেবে চিন্তে আমাকে ফলো করতে হয়। আমার একটা লেখায় লাইক করতেও ভাবতে হয় অনেক কিছু। আমার এমন কিছু পরিচিত ঘনিষ্ঠ মানুষ রয়েছে যারা ‘ভয়ে’ আমাকে আনফ্রেন্ড তো করেছেই- কেউ কেউ ব্লকও করে দিয়েছে!
 
আমি সত্যিই ফলোয়ার নিয়ে ভাবি না।
আমার সংগে কিছু সাহসী মানুষ রয়েছে- এদের আরও সাহস বৃদ্ধি ও কিছু দিক নির্দেশনা দিতে সামান্য কিছু লেখার চেষ্টা করি।
 
করে যাবো।
যতটুকু-ই পারি।
PDF24    Send article as PDF